ঢাকা, রবিবার - ২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আলোচিত সংবাদ

চেয়ারম্যানই প্রধান, উপজেলা আইনের ৩৩ ধারা বাতিল হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

ছবিঃ সংগৃহীত

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদ। আমরা জানি, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি, শুরু থেকেই স্থানীয় সরকার কাঠামোর এই স্তরে ক্ষমতায়নের এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অবস্থান ছিল মুখোমুখি। ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের টানাপড়েনের নিরসন ঘটেছে উচ্চ আদালতের এক রায়ে।

উপজেলা পরিষদে ইউএনওদের (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদসংক্রান্ত উপজেলা পরিষদ আইনের ৩৩ ধারা বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। ২০২১ সালের জুনে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা খর্ব করে ইউএনওদের ক্ষমতা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৯ মার্চ এ মর্মে রায় দেন, এখন থেকে উপজেলা পরিষদে ইউএনওরা সাচিবিক সহায়তা দেবেন। আমরা হাইকোর্টের এ রায়কে স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি, যুগান্তকারী এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা পরিষদে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব সংরক্ষণের পথ মসৃণ হলো।

কেউ কেউ এও বলেছেন, উপজেলা পরিষদ আইনে আরও দুটি কালাকানুন আছে। এগুলো বজায় রেখে ইউএনওদের কী নামে ডাকা হবে শুধু এই বিষয়টি সুরাহার মধ্য দিয়েই উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম কিংবা লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। এর একটি হচ্ছে, সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া। ওই আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করবে। ওই আইনেরই ৪২ ধারায় বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদ তার প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সুপারিশ গ্রহণ করে এর অনুলিপি সরকারের কাছে পাঠাবে। এই দুটি বিষয়কে আইনে বিদ্যমান কালাকানুন যেহেতু বলা হচ্ছে, সেহেতু আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে উপজেলা পরিষদকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকারের করণীয় সম্পর্কে আরও ভাবা প্রয়োজন। এর পরও আমরা বলব, হাইকোর্ট ওই রায়ে যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এবং বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন  কোনো সিন্ডিকেট দিয়ে ছাত্রলীগ চলবে না, সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের

আমাদের এখানে স্থানীয় সরকারের পরিধি বাড়লেও তাদের ক্ষমতা বাড়েনি। এর কারণ উন্নয়ননীতি পরিচালিত হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। স্থানীয় সরকার কাঠামো আছে, কিন্তু দর্শন উপেক্ষিত’ এই অভিযোগও রয়েছে। ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার’ এই প্রবাদটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, এ শুধু প্রবাদই নয়; এর বাস্তব প্রতিফলনও দৃশ্যমান।

আরও পড়ুন  ভারতে মুক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশের 'ভুবন মাঝি'

স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়িত করতে হলে উন্নয়ননীতির যেমন পরিবর্তন দরকার, তেমনি জনপ্রতিনিধিদের কাজের ক্ষেত্রে জিইয়ে থাকা বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোও সরাতে হবে। স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নির্বাচিত দায়িত্বরত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের পথ রুদ্ধ না করে এর শক্তিশালীকরণের যে যৌক্তিক দাবি নানামহল থেকে রয়েছে, এর বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। জনরায়ে জনসেবার দায়িত্ব যে বা যারাই পাবেন, তাদের পরিপূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করা নানা প্রেক্ষাপটেই জরুরি।

জাতীয় সংসদের সদস্যরা যেমন জনপ্রতিনিধি তেমনি উপজেলা চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় সরকার কাঠামোর স্তরে স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরাও সমভাবেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার কাঠামোর যেকোনো স্তরে ক্ষমতার ক্ষেত্রে অসাম্য কিংবা বিভাজন জিইয়ে রাখলে তা কতটা বিরূপ হতে পারে, তার অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের আদি ব্যবস্থা স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রতিটি স্তর শক্তিশালী করেই স্থানীয় উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার পথ সুগম করা উচিত।

আরও পড়ুন  সারাদেশে কালবৈশাখী ঝড়ের সতর্কবার্তা

আমরা দেখছি, দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন নিয়ে জটিলতা জিইয়ে আছে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের এখতিয়ারের প্রশ্ন তুলে উচ্চ আদালতের দারস্থ হওয়ার প্রেক্ষাপট এ থেকেই সৃষ্ট।  হাইকোর্টের এ সংক্রান্ত রায়ে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনের পথ খুলেছে বটে, কিন্তু উপজেলা পরিষদ আইনে এখনও প্রশ্নবোধক যে বিষয়গুলো রয়েছে এর নিরসনে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা চাই উপজেলা পরিষদ পূর্ণাঙ্গ রূপ পাক। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এখতিয়ারের নিরিখে সাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।

আমরা জানি, তৃণমূলে নারী জনপ্রতিনিধিরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে শামিল করা উচিত। গণতন্ত্রের ধ্রুপদী অনুশাসন হচ্ছে, স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের সূতিকাগার এই কথাটি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে। কোনো ক্ষেত্রেই একচ্ছত্র কর্তৃত্ব নয়, ক্ষমতার ভারসাম্য জরুরি।

ট্যাগঃ

আলোচিত সংবাদ