ঢাকা, -

আলোচিত সংবাদ

গভীর সাগর থেকে পাইপলাইনে তেল খালাস, জ্বালানি ব্যবস্থাপনার নতুন যুগে বাংলাদেশ

ছবিঃ সংগৃহীত

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

সৌদি আরব থেকে আনা ৮২ হাজার মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল গভীর বঙ্গোপসাগরে পাইপলাইনের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক তেল খালাসের মধ্য দিয়ে একটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ।

রবিবার (২ জুলাই) পাইপলাইনে তেল খালাস কার্যক্রম শুরু হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল জানান, অনেক উন্নত দেশকে টেক্কা দিয়ে গভীর সাগর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাসের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। সৌদি আরব থেকে আনা ৮২ হাজার মেট্রিক টন ক্রুড অয়েলের পরীক্ষামূলক খালাস শুরু হয়েছে গভীর বঙ্গোপসাগরে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন দিয়ে এই তেল আসবে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের কারণে তেল খালাসের সিস্টেম লস ও খরচ কমার পাশাপাশি সময় ২৫ দিন কমে মাত্র ২ দিনে নেমে আসবে।

প্রকল্পের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি আলাদা পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আনলোডিং করা হবে।

১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেই পাইপলাইন প্রথমে নিয়ে আসা হবে কালারমারছড়ায় সিএসটিএফ বা পাম্প স্টেশন অ্যান্ড ট্যাঙ্ক ফার্মে। সেখান থেকে বিভিন্ন পাম্পের মাধ্যমে ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল চলে যাবে আনোয়ারা উপজেলার সমুদ্র উপকূলে। সেখান থেকে আবার ৩৬ কিলোমিটার পাইপলাইন পাড়ি দিয়ে তেল নিয়ে যাওয়া হবে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।

আরও পড়ুন  আজ ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ইস্টার্ন রিফাইনারির এমডি লোকমান হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, এসব পাইপলাইনে ২০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এসপিএম থেকে মহেশখালীতে এসে যেখানে পাম্প হবে, সেখানে দুই লাখ টন ধারণ ক্ষমতার একটি স্টোরেজ নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে ক্রুড অয়েল থাকবে এক লাখ ২৫ হাজার টন।

বাকি ৭৫ হাজার টন হবে ডিজেল বা পরিশোধিত তেল। এর মানে হচ্ছে এই পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে তেলের সংরক্ষণ ক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ৫ লাখ টন সংরক্ষণ ক্ষমতা আছে। এর মধ্যে ক্রুড অয়েল সংরক্ষণ ক্ষমতা দুই লাখ ২৫ হাজার টন। বাকিটা পরিশোধিত তেল রাখার স্টোরেজ।

ইআরএলের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে সরকারিভাবে সমুদ্রপথে ৬০ লাখ টনেরও বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফার্নেস তেলসহ প্রায় এক কোটি টন তেলের প্রয়োজন হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্যতা কম হওয়ায় মাদার অয়েল ট্যাংকারগুলো সরাসরি খালাস করা সম্ভব হয় না।

আরও পড়ুন  সৌদির মার্কিন দূতাবাসে ইরানের ড্রোন হামলা

এর ফলে এসব ট্যাংকার গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট ছোট লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল খালাস করা হয়। তাতে এক লাখ ডিডব্লিউটি ট্যাংকার খালাস করতে লেগে যায় ১১ দিন। এ পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় এইচএসডি স্থানান্তরের জন্য ২০১৫ সালে পাইপলাইন বসানোর প্রকল্পটি (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) হাতে নেওয়া হয়।

সূত্র মতে, মোট ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ইতোমধ্যেই প্রকল্পের মেয়াদ তিনবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য কারণে খরচ আরেকটু বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লোকমান হোসেন বলেন, চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণের বিষয়ে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। এরপর কাজ শুরু হলে কোভিডের কারণে কাজ আবার পিছিয়ে যায়।

এ বিষয়ে মহেশখালী কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, মহেশখালীতে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ। রবিবার দিবাগত রাতে এসপিএম প্রকল্পে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল আনলোডের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। এরই মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন  অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে: সেনাপ্রধান

তিনি বলেন, বর্তমানে আমদানি করা জ্বালানি তেল বড় জাহাজ থেকে লাইটারে, সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পৌঁছায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকে। এতে ১ লাখ টনের তেলবাহী জাহাজ খালাস করতে সময় লাগে ১১ দিন। এসপিএম চালু হলে সময় লাগবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ জট কমবে, পরিবহন ব্যয়ে বছরে সাশ্রয় হবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। কমবে সিস্টেম লস। সেইসাথে বাড়বে বাংলাদেশের তেল মজুদ ক্ষমতা।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করতে পারে। এর দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে পরিশোধন ক্ষমতা ৩০ লাখ বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, এসপিএম প্রকল্পটি ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। ফলে জ্বালানির তেলের মজুদ ও সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং জোগানের নিরাপত্তা বাড়বে।

ট্যাগঃ

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের আরও

সর্বশেষ