কক্সবাজারের চকরিয়ায় অমানবিক নির্যাতনের পর মিফতা নামের ১০ বছরের এক শিশুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তারই গৃহকত্রী সোমা আকতার ও স্বামী মুহাম্মদ হারুন নামে এক দম্পতির বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত হারুন চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের হাজিয়ান এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফের পুত্র বলে জানা যায়।
জানা গেছে, নিহত শিশু মিফতার বাড়ি মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা গ্রামের পশ্চিম পাড়ায়। বাবা পেশায় জেলে এবং মা গৃহিণী। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে পড়ে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের হাজিয়ান গ্রামের হারুনের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করত।
নিহত শিশু মিফতার বাবা ছৈয়দ নুর বলেন, দেড় বছর আগে তার মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজের জন্য নিয়ে যায় মহেশখালী পৌরসভার সিকদার পাড়া গ্রামের প্রভাবশালী রশিদ বহদ্দারের স্ত্রী হাছিনা আকতার। সেখান থেকে মিফতাকে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের হাজিয়ান এলাকায় তার মেয়ে সোমার আকতারের শ্বশুর বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন। দেড় বছর ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে মেয়ের দেখা করতে কিংবা ফোনে কথা বলতে দেয়া হয়নি। রশিদ বহদ্দার এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তারা প্রতিবাদও করতে পারেনি।
তার মেয়েকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে মিফতার বাবা আরও জানান, বুধবার (১০ মে) দুপুর ২টার দিকে রশিদ বহদ্দার ফোন দিয়ে জানিয়েছেন মিফতা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি চকরিয়াতে মারা গেছে। তখন মেয়ের মরদেহ নিয়ে আসার অনুরোধ জানান মিফতার বাবা।
মিফতার মামা রুস্তম বলেন, চকরিয়া থেকে মহেশখালীতে মিফতার মরদেহ নিয়ে আসছে বলে আমাদের জানালেও পরে তারা কেউ ফোন ধরেনি এবং বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আমাদের পাশের এলাকা হিন্দুপাড়া রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তখন আমাদের সন্দেহ হয়।
অ্যাম্বুলেন্স চালক শাহাব উদ্দিন বলেন, চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের হাজিয়ান এলাকার হারুন মরদেহ পরিবহনের কথা বলে গাড়িটি ভাড়া করে। তার বাড়ি থেকে বিকেল সাড়ে ৩টায় কাপড় মোড়ানো মরদেহ গাড়িতে তুলে হারুন, একজন মহিলা ও অপর একজন পুরুষসহ মহেশখালীতে আসে।
অ্যাম্বুলেন্স চালক আরও জানান, গোরকঘাটা বরুনাঘাট এলাকায় তারা তিনজনই নেমে যায় এবং ইয়াসিন নামের অপর এক ব্যক্তি গাড়িতে উঠে। হিন্দুপাড়া এসে তিনিও কৌশলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তখন আমি মরদেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং তাদের ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেনি। ততক্ষণে স্বজনরা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বিস্তারিত জানাই।
হিন্দুপাড়া থেকে অ্যাম্বুলেন্সটি নিয়ে নিহত মিফতার স্বজনরা মহেশখালী পৌরসভার সিকদার পাড়াস্থ রশিদ বহদ্দারের বাড়িতে রাখে। তখন কেউ মরদেহ পরীক্ষা করে দেখেনি। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক জনতা সেখানে ভিড় জমায়। মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে এমন দাবির প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় মহেশখালী থানা পুলিশ।
মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ প্রনব চৌধুরী জানান, সিকদার পাড়া থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনের পর ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, সুরতহাল প্রতিবেদন করার সময় শিশুটির পুরো শরীর ঝলসানো দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটির শরীরে গরম তেল কিংবা গরম পানি ঢালা হয়েছে। মাথার পিছনে কয়েক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। এছাড়াও হাতে পা-সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এটা হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রটি আরও জানায়, মরদেহের সার্বিক অবস্থা দেখে কয়েকদিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ মরদেহের শরীর ঠান্ডা ছিল এবং আঘাতগুলোও পুরনো মনে হচ্ছে। সম্ভবত শিশুটির মৃত্যুর পর মরদেহ গোপন করার জন্য ডিপ ফ্রিজে রাখা হতে পারে।