বাংলা সনের তারিখ গণনার নিয়মানুযায়ী সংক্রান্তি অর্থ মাসের শেষ তারিখ। আর চৈত্রসংক্রান্তি অর্থ চৈত্র মাসের শেষ তারিখ। এর পরদিনই শুরু হয় নতুন বছর, আরেক বাংলা সন। বাংলা সনের প্রথম মাসের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখ।
একদিকে বছরের শেষ, অন্যদিকে আরেক বছরের শুরুর দিন। পিঠাপিঠি এ দুটি দিনকে ঘিরে যারপরনাই জাঁকজমপূর্ণ উৎসবের আয়োজন করে বাঙালিরা। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও মেতে ওঠে এ উৎসবে।
তবে বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আবহমান কাল ধরে চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরেই আয়োজনের পাল্লা ভারী। বাংলা সনের উৎসবের সঙ্গে সর্বাধিক জড়িয়ে আছে চৈত্রসংক্রান্তি।
ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে বাংলার মানুষ এ দিনটি উদযাপন করে। কখনো ধর্মীয় বিশ্বাস, আবার কখনো লোকজ উৎসবের আদলে আবহমান বাংলার চিরায়ত রূপ ফুটে এ দিনটিকে ঘিরে। একসময় বাংলায় প্রতিটি ঋতুরই সংক্রান্তির দিনটি উৎসবের আমেজে পালন করত বাঙালিরা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেসব উৎসব। তবে আজও বাঙালি আগলে রেখেছে সংক্রান্তির দুটি উৎসবকে। একটি চৈত্রসংক্রান্তি, অন্যটি পৌষসংক্রান্তি।
চৈত্রসংক্রান্তিতে ১৪৩০-কে স্বাগত জানাতে এখন উন্মুখ বাঙালি। সেই সঙ্গে বসন্তকে বিদায় জানিয়ে বাঙালির সামনে আগামীকাল শুক্রবার হাজির হচ্ছে আরও একটি নতুন বছর। বাঙালিরা মেতে উঠবে বর্ষবরণের উৎসবে। নতুন দিনের বার্তা নিয়ে বৈশাখ আসবে বাঙালির মাঝে।
বৈশাখকে বরণ করার জন্য চলছে সাজগোজ আর ধোয়ামোছা। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিদায়ি বছরের সব জঞ্জাল, অশুচিতাকে দূর করা হয় এদিন। লাল মলাটের হালখাতা নিয়ে নতুন বছরের অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। পুরোনো বছরের হিসাব-নিকাশ ঘুচিয়ে ফেলে ক্রেতার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরিতে চলে মিষ্টিমুখ।
সারা দেশের মতো রাজধানীর তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার, চকবাজার এলাকায় হালখাতা নিয়ে চলছে বিশেষ আয়োজন। রাজধানীর বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে উদযাপন করবে চৈত্রসংক্রান্তি।
এদিকে বাংলা নববর্ষকে বরণের জন্য রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রধান আয়োজন ছায়ানটের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। রমনার বটমূলে শেষ হয়েছে মঞ্চ নির্মাণ। এখন চলছে মঞ্চ সাজানোর কাজ। আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনা বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে গান গেয়ে বৈশাখকে স্বাগত জানাবেন।
কথিত আছে, বাংলা পঞ্জিকার চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়েছিল তিক্রা নক্ষত্র থেকে। পুরাণে আছে, সাতাশটি নক্ষত্রের নামে দক্ষ রাজ সুন্দরী কন্যাদের নামকরণ করেছিলেন। তার দুই কন্যার নাম যথাক্রমে চিত্রা ও বিশাখা। এক মাস ব্যবধানে জন্ম বলে এই দুই কন্যার নাম থেকে জন্ম হয় বাংলা দুই মাস; যথাক্রমে চৈত্র ও বৈশাখ। বাঙালি ও বাংলার চৈত্রসংক্রান্তির দিনে উল্লেখযোগ্য কিছু উৎসব রয়েছে।
বৈসাবি উৎসব, বিজু উৎসব, সাংগ্রাই উৎসব, চৈত্রসংক্রান্তির লোকজ নামাজ, চৈত্রসংক্রান্তির শরবত, চৈত্রসংক্রান্তির তালতলার শিরনি, চড়ক উৎসব, শিবের গাজন, গম্ভীরা পূজা, খেজুর ভাঙা উৎসব উল্লেখযোগ্য।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, চৈত্রসংক্রান্তি বাংলা ও বাঙালির উৎসব। এর মাধ্যমে বিদায়ি বছরের সব জঞ্জাল, অশুচিতাকে দূর করা হয়। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে বাঙালিরা এ দিনকে কেন্দ্র করে উৎসব পালন করে।














