ঢাকা, -

আলোচিত সংবাদ

কর্মবিরতিতে অচল প্রায় চট্টগ্রাম বন্দর, আমদানি-রপ্তানিতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা

ছবি- সংগৃহীত

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

চট্টগ্রাম বন্দরে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার কনটেইনারে পণ্য রপ্তানি হয়। লাগাতার কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিন গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এক কনটেইনার পণ্যও রপ্তানি হয়নি। আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে কোনো জাহাজ বন্দর জেটি ছেড়ে যেতে না পারায় পণ্য রপ্তানি হয়নি।

লাগাতার কর্মবিরতির কারণে পণ্য রপ্তানি না হওয়ায় বন্দর চত্বর, জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ ও বেসরকারি ডিপোতে আটকে আছে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার। এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের মূল্য আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এই কর্মবিরতি চলছে। গত শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে বন্দর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

গত অর্থবছরের হিসাবে দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। অথচ টানা পাঁচ দিন ধরে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের কোনো সংস্থার দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এতে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হলে তৈরি পোশাকশিল্পই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কারণ আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগই তৈরি পোশাকশিল্পের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি না হলে বিদেশি ক্রেতারা মূল্যছাড় চাইবে। এমনকি ক্রয়াদেশ বাতিলও করতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় খবর ইতিমধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। তাঁরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

আরও পড়ুন  বিএনপির সমাবেশে পুলিশ কনস্টেবল নিহত

মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী আরও বলেন, বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কাঁচামাল পেতে দেরি হবে। সেটি হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পোশাক তৈরিতে সময় কম পাওয়া যাবে। কোনো কারণে সময়মতো তৈরি পোশাক রপ্তানি না করা গেলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের।

রপ্তানি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে- সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) জাহাজ এমএসসি পোলো-২ গত ৩১ জানুয়ারি আমদানি কনটেইনার নিয়ে বন্দর জেটিতে ভেড়ে। জাহাজটি ৭৪৯ একক রপ্তানি কনটেইনার নিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে জেটি ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের কারণে জাহাজটি এখনো জেটিতে আটকে আছে।

এমএসসির একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, এই কনটেইনারগুলো সিঙ্গাপুরে নামিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী বড় জাহাজে তোলার সূচি ছিল। ৩ দিনেও জাহাজটি ছাড়তে না পারায় পুরো সময়সূচি ভেঙে পড়েছে। ফলে সময়মতো পণ্য বিদেশি ক্রেতার হাতে পৌঁছাচ্ছে না।

একই কোম্পানির আরেকটি জাহাজ এমএসসি জেনা ১ হাজার ৩২৯ একক কনটেইনার নিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে সাগরে অপেক্ষায় রয়েছে। এসব কনটেইনারের বড় অংশই পোশাকশিল্পের কাঁচামাল। জেটিতে থাকা জাহাজগুলো ছাড়তে না পারায় নতুন জাহাজও ভেড়ানো যাচ্ছে না। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হলে তৈরি পোশাকশিল্পই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কারণ আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগই তৈরি পোশাকশিল্পের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি না হলে বিদেশি ক্রেতারা মূল্যছাড় চাইবে। এমনকি ক্রয়াদেশ বাতিলও করতে পারে বলে জানান, বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী।

আরও পড়ুন  বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত

গতকাল বুধবার পর্যন্ত আমদানি কনটেইনার নিয়ে নয়টি জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। আজ বৃহস্পতিবার আরও নয়টি জাহাজ বন্দর জলসীমায় পৌঁছানোর কথা। অর্থাৎ অচলাবস্থার সুরাহা না হলে আগামী এক দিনের মধ্যে ১৮টি জাহাজ সাগরে এবং ১০টি জাহাজ জেটিতে আটকে পড়বে।আন্দোলনকারীদের বাধায় বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল-জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম মঙ্গলবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে পতেঙ্গার ‘আরএসজিটি চিটাগং’ টার্মিনাল থেকে মঙ্গলবার একটি জাহাজ ছেড়ে গেলেও গতকাল নির্ধারিত একটি জাহাজ ভেড়ানো যায়নি। ফলে টার্মিনালটিতে এখন কোনো জাহাজ নেই। বন্দর ও জাহাজে থাকা কনটেইনার যোগ করলে আটকে থাকা রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার।

ডিপোতে বাড়ছে রপ্তানি পণ্যের স্তূপ- কনটেইনার ডিপো সমিতির হিসাবে, আন্দোলন শুরুর আগে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানির অপেক্ষায় ছিল প্রায় ৮ হাজার একক কনটেইনার। বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮১৭টিতে। বিকেলের পর তা ১১ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বন্দর ও জাহাজে থাকা কনটেইনার যোগ করলে আটকে থাকা রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার।

কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, সারা দেশে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো থেকে কাভার্ড ভ্যানে প্রতিদিন রপ্তানি পণ্য ডিপোগুলোতে আসছে। বর্তমানে রপ্তানি পণ্য নিয়ে আসা সাড়ে তিন হাজারের বেশি কাভার্ড ভ্যান রয়েছে ডিপোগুলোতে। এসব রপ্তানি পণ্য কনটেইনারে বোঝাই হচ্ছে। তবে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক না থাকায় এসব কনটেইনার বন্দরে নিয়ে রপ্তানির জন্য জাহাজে তুলে দেওয়া যাচ্ছে না। তাতে দিন দিন রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

আরও পড়ুন  থাইল্যান্ড যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ একক কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়। একই সময়ে এসব পণ্যের মোট মূল্য ছিল ৪ হাজার ২৩২ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রতি কনটেইনারে গড়ে প্রায় ৫১ হাজার ডলারের রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়। এই হিসাবে বর্তমানে আটকে থাকা ১৩ হাজার কনটেইনারে রপ্তানি পণ্যের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা ৮ হাজার কোটি টাকা।

অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেই- একদিকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতি চলছে। এর মধ্যেই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সমাধানের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং দফায় দফায় কর্মচারী বদলির আদেশ আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতেই এই আন্দোলন। শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করছেন। কিন্তু সমাধানের কোনো উদ্যোগ না থাকায় বা দাবি না মানায় কর্মসূচি চলবে।

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের আরও

সর্বশেষ