বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ থাকলেও তাসনুভা আনান শিশির ওরফে কামাল হোসেন নামের ট্রান্সজেন্ডার এক ব্যক্তি বিয়ে করেছেন।
গত শুক্রবার (১০ জুলাই) রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে হিন্দু ধর্মের রীতিতে এক সনাতনী যুবককে বিয়ে করেন তিনি।
শারীরিক গঠনে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করা ওই ব্যক্তি অপর একটি পুরুষকে বিয়ে করার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও নিন্দা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। দেশে সমলিঙ্গের বিয়ে সরাসরি নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিভিন্ন মহল ক্ষোভ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭ ধারা অনুযায়ী, প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি যদি তাঁর জন্মগত লিঙ্গের মানুষের সাথে (যেমন: একজন ট্রান্স-উইমেন বা পুরুষ থেকে রূপান্তরিত নারী যদি অন্য কোনো পুরুষের সাথে) বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে প্রচলিত সামাজিক ও আইনি দৃষ্টিতে সেটিকে ‘সমলিঙ্গের বিয়ে’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে সমলৈঙ্গিক বিয়ের কোনো আইনি বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যেহেতু বাংলাদেশে লিঙ্গ পরিবর্তনের (হরমোন থেরাপির মাধ্যমে) পর আইনি নথিপত্রে (যেমন: জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট) লিঙ্গ পরিবর্তন করার স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি নীতিমালা বা অধিকার নেই, তাই কেউ নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করলেও আইনের চোখে তিনি তাঁর জন্মগত লিঙ্গেই থেকে যান। ফলে একজন রূপান্তরিত নারী বা পুরুষ বিপরীত লিঙ্গের কাউকে বিয়ে করতে চাইলেও নথিপত্র এবং ধর্মীয় আইনের জটিলতার কারণে সেই বিয়ে আইনি বৈধতা পায় না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিয়াউল হক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে হয়ে গেল ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। অথচ প্রশাসন নিরব। ভাবুন তো, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে যদি একটা বাল্যবিবাহ হতো, তাহলে মিডিয়াপাড়া ও প্রশাসনের অবস্থান কেমন হতো। ম্যারিজ রাইটস ও আইনে বাল্যবিবাহের বিশেষ বিধান থাকা সত্ত্বেও চারদিকে হইচই পড়ে যায়।
তিনি বলেন, ট্রান্সজেন্ডার এর মত নিষিদ্ধ ও প্রকৃতি বিরোধী সমকামী বিয়ে যেখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেখানে মিডিয়াপাড়া কিংবা প্রশাসনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিয়েটা হয়েছে পুরুষে-পুরুষে। ছবির মহিলা কথিত তাসনুভার আসল নাম হচ্ছে কামাল হোসেন। সে একজন পুরুষ। এটি একটি সমকামি বিয়ে। দ্রুত এদেরকে ও এদের সহযোগীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় ঢাকেশ্বরী মন্দির কমিটির সদস্য দিলীপ ঘোষের সাথে। তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে কমিটির অন্য কার্যকর্তা দীপেন চ্যাটার্জির সাথে কথা বলার অনুরোধ করেন। দীপেন চ্যাটার্জির সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে কথিত সমকামী বিবাহের আয়োজনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে কওমি পরিষদ বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান কওমি পরিষদ বাংলাদেশের সভাপতি এবং রাজধানীর গুলিস্তান পীর ইয়ামেনী জামে মসজিদের খতিব মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান, সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিবারব্যবস্থা এবং নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সমকামিতা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অবস্থায় প্রকাশ্যে সমকামী বিবাহের নামে কোনো আয়োজন করা আইনের প্রতি অবজ্ঞা এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামসহ দেশের প্রধান ধর্মগুলো সমকামিতাকে বৈধতা দেয় না। তাই কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় বা পবিত্র স্থানকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বিতর্কিত কর্মসূচি আয়োজন ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এবং সামাজিক সম্প্রীতির জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী বলেন, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি হয়েছে কি না- এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইন অমান্য করে সমাজে অনৈতিকতা ও বিকৃত সংস্কৃতি বিস্তারের যেকোনো অপচেষ্টা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্কিত আয়োজন যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
বিবৃতির শেষে কওমি পরিষদ বাংলাদেশের সভাপতি দেশবাসীর প্রতি শান্তি, শৃঙ্খলা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় নৈতিকতা রক্ষায় সচেতন থাকার আহ্বান জানান এবং আইন ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অনুরোধ করেন।
ঢাকেশ্বরী মন্দির ট্রান্সজেন্ডার নারীর বিয়ে পড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করল। তাসনুভা আনান শিশির জন্মগতভাবে শারীরিক গঠনে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেকে একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে রূপান্তর করেন। তিনি ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের প্রথম প্রকাশ্য ট্রান্সজেন্ডার সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে বৈশাখী টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করেন।
পরবর্তীতে তিনি নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে পাড়ি জমান আমেরিকা। এখন সবাইকে চমকে দিয়ে হিন্দু রীতি অনুযায়ী মাথাভর্তি সিঁদুর ও শাঁখা পড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন পুরুষকে বিয়ে করেন। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হিন্দু রীতি অনুযায়ী তাদের বিবাহ সম্পূর্ণ হয়। এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে হিসেবে আলোচিত এবং সমালোচিত।













