ঢাকা, -

আলোচিত সংবাদ

তেলেই শুধু তেলেসমাতি, বোতলজাত সয়াবিন মিলছে না বাজারে

ছবি- সংগৃহীত

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে বাজারে ক্রেতার চাপ বেড়েছে। রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন সবাই। কিন্তু রাজধানীর বাজারে সব পণ্যের দেখা মিললেও পাওয়া যাচ্ছে না সয়াবিন তেলের বোতল। রান্নায় দরকারি পণ্যটির খোঁজে তাই ক্রেতাদের ঘুরতে হচ্ছে দোকানে দোকানে। রোজার শুরুতেই ভোজ্যতেলে এমন বিড়ম্বনায় বেজায় ক্ষুব্ধ ভোক্তারা।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অবস্থাও খুব নাজুক। বোতলজাত সয়াবিন তেল মিলছে না বাজারে। দাম বেড়েছে খোলা সয়াবিন তেলেরও। এর মধ্যে সরিষার তেলের দামও বাড়তির দিকে। রোজা শুরুর দুই সপ্তাহ আগে ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে বলেছিলেন, সরবরাহ খুবই ভালো। তাই এবার একটি পণ্যের দামও বাড়বে না। এ ছাড়া বাড়তি দাম রাখার কারণে প্রতিদিনই জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন দোকান ও বাজারকে জরিমানা করে চলেছেন। কিন্তু কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, রোজা শুরু হলেও সয়াবিন তেলের সরবরাহ বাড়েনি। আগের মতোই কম তেল সরবরাহ করছে ডিলাররা। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটেও গতকাল বোতলজাত সয়াবিন তেলের খোঁজে দোকানে দোকানে ঘুরতে দেখা গেছে অসংখ্য ক্রেতাকে। সেখানেও বিক্রেতাদের একই জবাব- সরবরাহ নেই। ডিলাররা যতটুকু দিচ্ছেন তা মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, বাজারে কোনো সয়াবিনের বোতল নেই। ডিলাররা সরবরাহ করছে না। কোম্পানির কাছে চাহিদা দিচ্ছি ২০-২৫ কার্টন, কিন্তু পাচ্ছি ২-৩ কার্টন। এগুলো অল্প সময়েই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। রোজায় চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ কারণে এ সময়ে সরবরাহ বাড়ার কথা।

বাজারে সয়াবিনের বোতল সরবরাহে ঘাটতির প্রসঙ্গে একাধিক ডিলারের সঙ্গে কথা বললেও তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। অপরদিকে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও সারা পাওয়া যায়নি।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, দাম এক দফা বাড়ানো হলেও আরও বাড়াতে চাইছে কোম্পানিগুলো। সে জন্য পুরনো কায়দায় সংকট তৈরি করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন  শীঘ্রই প্যারিস থেকে ঢাকায় ফিরবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

খোলা সয়াবিন তেলের মোকাম রাজধানীর মৌলভীবাজারেও তেলের বাজার চড়া যাচ্ছে। আগের মতো সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়তি রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা।

এদিকে চট্টগ্রামে তেলেই শুধু তেলেসমাতি চলছে না, এক বছরের ব্যবধানে ছোলার দাম বেড়ে ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা হয়েছে। দুদিন ধরে আলুর সরবরাহে সংকট দেখিয়ে প্রতি কেজি ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকায় উঠে গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক বছর আগে যে ছোলা প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হতো, এবার তা ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুদিন আলুর সরবরাহে ঘাটতি দেখা যাওয়ায় ২০ টাকার আলুর কেজি ৩০ টাকায় উঠেছে। ক্ষীরার কেজি ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকায়, কাঁচামরিচ ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকায়, বেগুন ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকায় উঠে গেছে দাম। দেশে ব্যাপক আমদানি সত্ত্বেও সয়াবিন তেল বিশেষ করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে সংকট রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দামি ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ না থাকার সুযোগে রাতারাতি অখ্যাত কোম্পানিগুলো খোলাবাজারের সয়াবিন তেল বোতলজাত করে বাজারে সরবরাহ করছে।

গতকাল চট্টগ্রাম নগরীর একাধিক বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে। বিশেষ করে পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এই সংকট চলছে বলে জানান বিক্রেতারা। তারা বলেন, চাহিদার বিপরীতে বোতলজাত তেলের সরবরাহ খুব কম। কিন্তু এই মুহূর্তে চাহিদা অনেক। কারণ হিসেবে মোমিন রোডের ব্যবসায়ী কুতুব উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, রমজানে ভাজাভোজির ব্যাপার বেশি। সক্ষম ক্রেতারা ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে চান। দাম তাদের কাছে ব্যাপার নয়। কিন্তু আমরা তো দিতে পারছি না।

আরও পড়ুন  রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহন শুরু, ‘প্রহসন’ বলছে ইউক্রেন

আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্র বলছে, সয়াবিন তেলের দর গত তিন মাসে নিম্নমুখী রয়েছে। বিশ্ব বাজারে পণ্যমূল্যের পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে গত নভেম্বর মাসে প্রতিটন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১১৪৫ ডলার। ডিসেম্বরে যা কমে হয় ১০৬৪ ডলার এবং গত জানুয়ারিতে তা আরও কমে ১০৬১ ডলারে নেমেছে। অথচ দেশে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। আরও বাড়ানোর পাঁয়তারাও চলছে।

এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন। রমজানে চাহিদা বেশি থাকে। এ মাসে চাহিদা ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টন।

বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট ও সরবরাহ নিয়ে চলতি ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় ট্যারিফ কমিশন জানিয়েছে, সয়াবিন তেলের আমদানি বেড়েছে। দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে, কোনো ঘাটতি নেই। যেটি হয়েছে তা কৃত্রিম এবং প্রকৃত তথ্যের ঘাটতি থেকে সৃষ্ট। সভায় উৎপাদনকারীরাও জানান, সয়াবিন তেলের সরবরাহ বেড়েছে।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রমজান মাস সামনে রেখে বাজারে ভোজ্যতেলের বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অধিক পরিমাণ ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে। ভোজ্যতেল সরবরাহের পরিমাণ বিবেচনায় সংকটের কোনো সুযোগ নেই। বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় কিছু ব্যবসায়ীর মজুদের প্রবণতা থেকে যদি সংকট হয়ে থাকে, তা অচিরেই কেটে যাবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি ভোজ্যতেল আমদানি করেছে, যা ৭ থেকে ১০ দিনের ভেতরে বাজারে প্রবেশ করবে। পাইপলাইনে আছে দেড় লাখ মেট্রিক টন।

এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বসির উদ্দিনও আশ্বস্ত করেছিলেন, সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে সয়াবিন তেলের বাজার স্থিতিশীল থেকে নিম্নমুখী হয়ে যাবে এবং সরবরাহের ঘাটতি দূর হবে। কিন্তু বাজারের চিত্র বলছে, বোতলের তেলের সংকট রয়েই গেছে। খোলা তেলের দামও চড়া। নেপথ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। সরকারি সংস্থার তদারকি অভিযানেও বেরিয়ে আসছে কারসাজির তথ্য।

আরও পড়ুন  ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৯৯৯ টাকা

গত বৃহস্পতিবার কারওয়ানবাজারে অভিযান চালিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেখতে পায়, সেখানকার অনেক দোকানে আড়ালে ভোজ্যতেল লুকিয়ে রেখে ক্রেতাকে তেল নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ তল্লাশি করে গোপন জায়গায় ৫ লিটারের বোতলের ২০০টিরও অধিক কার্টনের মজুদ খুঁজে পায় সংস্থাটি। আরও দেখা যায়, কিছু খুচরা ব্যবসায়ী সয়াবিন তেল গোপনে বিক্রি করছেন। ৫ লিটারের বোতলে এমআরপি ৮১৮ টাকা লেখা থাকলেও বিক্রি করা হচ্ছে ৮৫০-৮৫২ টাকায়। এর আগে আরেক অভিযানে দেখা গেছে, বেশি লাভের আশায় খুচরা বিক্রেতারা বোতল কেটে ড্রামে ঢেলে খোলা হিসেবে বিক্রি করছেন।

বারবার একই কায়দায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেও এ থেকে ভোক্তারা পরিত্রাণ পাচ্ছেন না। এর পেছনে ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাই দায়ী বলে মনে করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, বিটিটিসির বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানালেন, সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু সংকট কেন, তা তারা জানেন না। তারা তো এভাবে দায় এড়াতে পারেন না। ডিস্ট্রিবিউটররা তেল নিয়ে কি করেছে, সেটা দেখার দায়িত্বও তাদেরই। এভাবেই কোম্পানি-ডিস্ট্রিবিউটর মিলে ভোক্তার পকেট কাটে। ট্যারিফ কমিশন কিভাবে মূল্য সমন্বয় করছে তা জানা নেই। এর মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনে ও বাজার মনিটরিংয়ে দুর্বলতা রয়েছে। যদিও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর প্রতিদিন কয়েকটি বাজারে তদারকি করছে, জরিমানা করছে। কিন্তু তাদের জনবল কম। মনিটরিংয়ে এমন দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অসাধুরা।

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের আরও

সর্বশেষ