দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ও কক্সবাজারের আইকনিক রেলস্টেশন প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শনিবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটা গর্বের দিন। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে সত্যি আমি খুব আনন্দিত। একটা কথা দিয়েছিলাম, কথাটা রাখলাম। কক্সবাজার এমন একটি সমুদ্র সৈকত, যেটা বিশ্বে বিরল, বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম বালুকাময় সমুদ্র সৈকত। ৮০ মাইল লম্বা, সম্পূর্ণটাই বালুকাময়।
আইকনিক স্টেশনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে নেটওয়ার্কের ৪৮তম জেলা হিসেবে যুক্ত হচ্ছে কক্সবাজার। সেই সঙ্গে পর্যটকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলো।
পরে প্রধানমন্ত্রী পতাকা উড়িয়ে ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ডুয়েলগেজ সিঙ্গেল রেললাইনে ট্রেন যাত্রা শুরু করেন এবং কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন থেকে রামু রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত যাত্রা করেন।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। ১১টা ২৫ মিনিটে আইনিক রেল স্টেশন এলাকায় পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানিয়ে রাখাইন নৃত্য পরিবেশন করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণী দল। নৃত্য শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রটোকল ভেঙে রাখাইন তরুণীদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
সুধী সমাবেশে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরোয়ার কমল, আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার লোকজন অংশ নেন।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ উন্মোচন করায় দক্ষিণাঞ্চল উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। নতুন এই রেললাইনের ফলে চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত দ্রুত ও নির্বিঘ্নে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত হবে। ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের প্রথম রেলপথের সংযোগ স্থাপনে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, ডুলাহাজরা, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও ঘুমধুমে ৯টি স্টেশন রয়েছে। এই স্টেশনগুলোতে সম্পূর্ণ কম্পিউটার-ভিত্তিক ইন্টারলকিং সিগন্যাল সিস্টেম এবং একটি সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক থাকছে।
২০১১ সালের ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ফাস্ট ট্র্যাক মেগা রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়।
নতুন রেললাইনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে আগামী মাসে।
ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এটি মিয়ানমার এবং এর বাইরেও যোগাযোগ উন্নত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেললাইনটি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এবং কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু ও উখিয়া উপজেলাসহ ৮টি উপজেলা অতিক্রম করবে।
লাইনটি দোহাজারী গ্রাম থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ দিকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলবে। প্রথম ২৯ কিলোমিটার অংশ চট্টগ্রাম জেলার সমতল, উন্মুক্ত ভূমিজুড়ে এবং পরবর্তী ৩৩ কিলোমিটার কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার কৃষিজমি ও বনভূমির মধ্য দিয়ে যাবে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে রেললাইনটি মিয়ানমার সীমান্তের পাশাপাশি মাতারবাড়ী দ্বীপে নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। সম্প্রসারিত অংশে দু’টি স্টেশন থাকবে- উখিয়া ও ঘুমধুম। এতে থাকবে ৯টি কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলক সিগন্যাল সিস্টেম ও ৯টি ডিজিটাল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম।
এই রেল চলাচলের জন্য সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩টি ছোট সেতু, ২০১টি কালভার্ট, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া এলাকায় একটি ফ্লাইওভার, ১৪৪টি লেভেল ক্রসিং এবং রামু ও কক্সবাজার এলাকায় দুটি মহাসড়ক ক্রসিং নির্মাণ করা হয়েছে।