ঢাকা, -

আলোচিত সংবাদ

চান্দগাঁওয়ে তাহসীন হত্যাকান্ড: কিলিং মিশনে ব্যবহৃত গাড়ি জব্দ

ছবি- সংগৃহীত

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

প্রথমে ভাড়া করেন একটি নোহা মাইক্রোবাস। এরপরই দলবল নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ওরফে বুড়ির নাতি ছুটেন কিলিং মিশনে নগরীর চান্দগাঁওয়ে। মাইক্রোবাস থেকে নেমেই স্থানীয় ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসীনকে (২৭) গুলি করে হত্যা করেন। এ ঘটনার দুদিন পেরোলেও সেই সাজ্জাদ অধরা। তবে কিলিং মিশনে ব্যবহার করা ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাসটি জব্দ করেছে পুলিশ। গাড়িচালক পলাতক।

মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) রাতে সাজ্জাদসহ পাঁচজনকে আসামি করে চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহতের বাবা মো. মুছা।

নিহত তাহসীন চান্দগাঁও থানার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীরপুল এলাকার দিলা মিস্ত্রি বাড়ির মো. মুসার ছেলে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে নগরীর চান্দগাঁও থানার অদূরপাড়া জাগরনী ক্লাব সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে ঘটে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড। গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে পাঁচলাইশ থানার আবদুল হামিদ সড়কের রওশন হাইটস নামক একটি ভবনের পার্কিং থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি জব্দ করা হয়। যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর চট্ট মেট্রো চ ১১-৩১৮৯।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, মাইক্রোবাসটির মালিক পাঁচলাইশ থানা এলাকার মোতাহের আলীর ছেলে আলী মোয়াজ্জেম শাহীন নামক এক ব্যক্তির। আর সেটি তিনি ইকবাল নামে এক চালককে মাসিক চুক্তিতে ভাড়ায় দিয়েছিলেন।

মাইক্রোবাসটির মালিক আলী মোয়াজ্জেম শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, দু’মাস আগে ইকবাল আমার কাছে মিনতি জানায় আমি যেন তাকে মাইক্রোবাসটি ভাড়ায় দিই। পরে তার অনুরোধে আমি মাসিক ২২ হাজার টাকার চুক্তিতে গাড়িটি ভাড়ায় দিই। সে আমার ভাড়ার টাকাও পরিশোধ করেনি। গত এক সপ্তাহ ধরে আমি তার খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরশু রাতে (হত্যাকাণ্ডের দিন) ফোন করে সে আমাকে জানায় টাকা দিয়ে দিবে পরদিনই। তখনও আমি জানতাম না এমন একটি ঘটনার সাথে সে জড়িত। এরপর পুলিশ গতকাল রাতে মাইক্রোবাসটি নিয়ে যায়।

পুলিশ বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে মাইক্রোবাস চালক ইকবালেরও যোগসাজশ রয়েছে। তবে চালক এবং এ ঘটনার মূলহোতা সাজ্জাদের অবস্থান এখনও পুলিশ শনাক্ত করতে পারেনি।

আরও পড়ুন  চান্দগাঁওয়ে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, গোপনে লাশ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) কাজী মো. তারেক আজিজ জানিয়েছেন, সন্ত্রাসী সাজ্জাদের এখনও পর্যন্ত কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি মঙ্গলবার রাতে জব্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদসহ পাঁচজনকে এজাহারনামীয় আসামি করে চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তাহসীনের বাবা মো. মুছা।

এজাহারনামীয় অন্য আসামিরা হলেন- বায়েজিদ বোস্তামি থানার পশ্চিম শহীদ নগর এলাকার মো. আলমের ছেলে মো. হাসান (৩৬), একই থানার চাইল্যাতলী এলাকার মো. খোকনের ছেলে মোহাম্মদ (২৮), রাউজান থানার কদলপুর এলাকার মৃত আনোয়ারের ছেলে মো. খোরশেদ (৪০) এবং চান্দগাঁও থানার মাইজপাড়া হাজিরপুল এলাকার দোস্ত মোহাম্মদের ছেলে মো. হেলাল (৩৫)।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, নিহত তাহসীন ওই এলাকায় ইট ও বালুর ব্যবসা করতেন। গত কিছুদিন যাবত অজ্ঞাত লোকজন মোবাইল ফোনে তাকে হুমকি দিচ্ছিলো। গত ২১ অক্টোবর বিকেলে তিনি চান্দগাঁও থানার অদূরপাড়া এলাকার ওমর ফারুকের চায়ের দোকানে বসেন। এ সময় কালো রঙের নোহা গাড়িতে এসে আসামিরা শটগান দিয়ে অতর্কিতভাবে তার ওপর গুলিবর্ষণ করে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিহত তাহসীন নগরীর ওমরগণি এম ই এস কলেজের ছাত্র ছিলেন। ওই কলেজের রাজনীতিতে তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটির সদস্য আরশাদুল আলম বাচ্চুর অনুসারী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন প্রকাশ বাবলা স্থানীয় প্রভাব বজায় রাখতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ছাত্রলীগকর্মীদের সাথেও সখ্যতা গড়ে তোলেন। সেই সুবাদে তাহসীনও সারোয়ারের সাথেই চলাফেরা করতেন। তবে সরোয়ারের সাথে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব চলে আসছে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের।

আরও পড়ুন  বসুন্ধরায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাটহাজারী, বায়েজিদ বোস্তামি, চান্দগাঁও এবং পাঁচলাইশ এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ প্রকাশ বুড়ির নাতি। তিনি বায়েজিদ বোস্তামী থানা সংলগ্ন হাটহাজারীর শিকারপুর ১ নং ওয়ার্ডের মো. জামালের ছেলে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, সাজ্জাদের মা বাবা কেউই নেই। নিকট আত্মীয়ের মধ্যে নানিই সম্বল। গত দুই মাসে এসব এলাকায় তিনটি হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাজ্জাদ এবং সরোয়ার দুজনেই চট্টগ্রামের এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, স্থানীয়দের কাছে ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত, আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি সাজ্জাদ আলী খানের শিষ্য। যিনি বর্তমানে ভারতে পলাতক আছেন। স্থানীয়রা সাজ্জাদ আলী খানকে ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবে চিনলেও তিনি শিবিরের কেউ নন বলে দাবি করেছে চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর ছাত্রশিবির।

সাজ্জাদ আলী খানের সহযোগী হিসেবে অপরাধ জগতে পা রাখার পরই বেপোরোয়া হয়ে ওঠেন ছোট সাজ্জাদ প্রকাশ বুড়ির নাতি। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির ১১টি মামলা রয়েছে। সবশেষ ১৭ জুলাই চান্দগাঁও থানা পুলিশ অস্ত্রসহ সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করে। অবশ্য পরের মাসে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন।

আরও পড়ুন  কাপ্তাই সড়কে দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় উত্তাল চুয়েট

আর সারোয়ার ওরফে বাবলা ভারতে পলাতক সেই সাজ্জাদ আলী খানের হয়েই একসময় কাজ করতেন। তিনি নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার খোন্দকার পাড়ার কালা মুন্সির বাড়ির আব্দুল কাদেরের ছেলে। সারোয়ারের বিরুদ্ধে নগরীর ডবলমুরিং, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামি থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে মোট ১৮টি মামলা রয়েছে। সবগুলোতে জামিনে রয়েছেন তিনি।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটার দিকে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কালারপুল এলাকায় শটগান হাতে সাজ্জাদ হোসেনসহ আরও দুজন গুলি করতে করতে একটি নির্মাণাধীন ভবনে প্রবেশ করেন। এরপর ওই ভবন মালিকের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।

২৯ আগস্ট নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে মাসুদ কায়সার (৩২) ও মোহাম্মদ আনিস (৩৮) নামে দুজনকে হত্যা করা হয়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে দুপক্ষের দ্বন্দ্বের জেরেই এ খুন হয়। এই চাঞ্চল্যকর ডাবল মার্ডারের ঘটনার দুই মামলায় সাজ্জাদ ও তার সহযোগীদের আসামি করা হয়।

এছাড়া ৫ জুলাই বায়েজিদ থানার ভূলিয়াপাড়া এলাকায় একটি বাসায় গুলি করেন সাজ্জাদ তাঁর সহযোগীদের নিয়ে। আর গত বছরের ২৭ অক্টোবর চাঁদা না পেয়ে দলবল নিয়ে মো. হাছান নামের এক ঠিকাদারের চান্দগাঁও হাজীরপুল এলাকার বাসায় গিয়েও গুলি করে ওরা।

প্রকাশ্যে বারবার এমন অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটলেও পুলিশ যেন ‘ছুঁতেও’ পারছে না সাজ্জাদ-সারোয়ারকে। আর এ নিয়ে আতঙ্কে আছেন বায়েজিদ-চান্দগাঁওয়ের স্থানীয়রা। এলাকায় সাজ্জাদের চাঁদা দাবির বিষয়টি অনেকটা প্রকাশ্যেই চলে। মূলত নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক চাঁদা নেয় এই সন্ত্রাসী।

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের আরও

সর্বশেষ