ঢাকা, -

আলোচিত সংবাদ

‘বাংলাদেশে দমন-পীড়ন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনও বিরাজ করছে’

ছবি- সংগৃহীত

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও দমন-পীড়ন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনও বিরাজ করছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে গণবিক্ষোভের এক বছর পূর্ণ হলেও দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

বুধবার (৩০ জুলাই) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। এরপর থেকেই দেশজুড়ে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এইচআরডব্লিউ-এর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনার দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নামা হাজারো মানুষের আশা এখনও অপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার যেনও একটি অদল-বদলের রাজনীতিতে আটকে গেছে। এখানে প্রতিশোধ প্রধান হয়ে উঠেছে, অধিকার নয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাপক গুম, নিখোঁজ ও নিপীড়নের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। তবে একই সঙ্গে শুরু হয়েছে অন্য ধারার দমন। এতে সরকারবিরোধী ভাবাপন্ন ব্যক্তিদের হয়রানির জন্য শুরু হয়েছে নির্বিচার গ্রেফতার।

আরও পড়ুন  জুলাই ঘোষণাপত্রকে নতুন সংবিধানে যুক্ত করতে হবে: নাহিদ ইসলাম

এতে বলা হয়েছে, ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ ঘিরে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন। এরপর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করে। এদের অধিকাংশই বেনামি আসামি। গ্রেফতার করা হয় শত শত মানুষকে। এদের অনেকেই আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন সরকারবিরোধী কর্মী হিসেবে।

এইচআরডব্লিউ বলছে, ৬ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ অন্তত ৯২ হাজারের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এগুলোর বেশিরভাগই হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত।

ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামকে অন্তত ৬৮টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডে ৩৬টি ঘটেছে যখন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। তবু তাকে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে আটক রাখা হয়েছে। মামলার বিচার এখনও শুরু হয়নি।

এইচআরডব্লিউ বলছে, অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচার হওয়া জরুরি হলেও বর্তমানে যেসব মামলা হচ্ছে সেগুলোর অনেকটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার আমলের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ খুবই সীমিত।

বাংলাদেশ পুলিশ জুলাই মাসে বিবিসিকে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ ওই অভিযানে র‍্যাবসহ বহু পুলিশ ও সামরিক বাহিনী সদস্য জড়িত ছিলেন।

আরও পড়ুন  ঢাকাতেই সরকারের পতন ঘটানো হবে: মির্জা ফখরুল

২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট সরকার গঠনের তিন সপ্তাহের মাথায় গুম তদন্তে কমিশন গঠন করে সরকার। দুই দিন পর বাংলাদেশ সই করে গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তিতে। কমিশনে ১ হাজার ৮০০-র বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। দুটি অন্তর্বর্তী রিপোর্ট ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে।

তবে কমিশন জানিয়েছে, অভিযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রমাণ নষ্ট করছে, তদন্তে সহযোগিতা করছে না। এমনকি অনেকে দেশ ছেড়েও পালিয়েছে।

২০২৪ সালের শেষ দিকে গঠিত ১১টি আইন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও নারী অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ জমা দিলেও এখনও সেগুলো সরকার গ্রহণ করেনি। সর্বদলীয় ঐকমত্য গড়ার প্রচেষ্টাও ধীরগতির।

নারীর নিরাপদ, পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়নেও তেমন অগ্রগতি নেই।

বিশেষ ক্ষমতা আইনে শত শত ব্যক্তিকে এখনও আটক রাখা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ আটক করা হয়েছে ৮ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে। অনেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে দাবি করেছেন তাদের পরিবার।

আরও পড়ুন  আতংক ছড়াতে মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে উড়ো চিঠি: র‍্যাব ডিজি

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটির বিচার কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ৩ আগস্ট। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলার তদন্তেই অগ্রগতি নেই। বহু বন্দিকে অভিযোগ ছাড়া আটক রাখা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ বলছে, মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নিরাপরাধ আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে, বিচারপতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া র‍্যাবসহ নির্যাতনকারী বাহিনীগুলোর সংস্কার জরুরি।

বিদেশি সরকার ও জাতিসংঘের প্রতি সংস্থাটি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের মতো দেশগুলো যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিদেশে পালিয়ে থাকা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, কেউই জানে না কীভাবে এই সরকার সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে। তবে যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

তিনি আরও বলেন, যেসব রাজনৈতিক দল অতীতে নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তাদের দায়িত্ব এখন একটি এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে আর কখনও এমন অন্যায় ঘটবে না। দেশের সব নাগরিকের অধিকার সমানভাবে রক্ষা পাবে।

আলোচিত সংবাদ

এ বিভাগের আরও

সর্বশেষ